মিসটেক

মিসটেক

আহম্মেদ ইমতিয়াজ নীল

এক. 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার আল্লার দরগার আসগার মিয়ার বাড়িতে গত এক সপ্তাহ ধরে শোকের মাতম। এই বাড়ির একমাত্র নাতি, পুকুরের পানিতে ডুবে মারা গেছে, আজ একসপ্তাহ হল। আসগার মিয়া, তার বৌ নাজমা বেগম, বাড়ির কারোরই মন ভালো নেই। নাতিটি যদিও ছিল পালিত, তারপরও সারা বাড়ি ছুটে বেড়াত সবসময়, ছোটখাটো দুস্টুমিতে বাড়ি মাতিয়ে রাখত।

আসগার মিয়া দীর্ঘদিন কুয়েত ছিলেন। বছর চার হল পাকাপাকি ভাবে দেশে চলে এসেছেন।| স্ত্রী নাজমা বেগম পাকা গৃহিনী, বলতে গেলে বাড়ির কর্ত্রী তিনিই, বাড়ির সবকিছু তার কথাতেই চলে। আসগার মিয়ার দুই ছেলে, ছোট আক্কাস ওমান থাকে, এখনও বিয়ে-শাদি করেনি। তার জন্য মেয়ে দেখছেন আসগার মিয়া। অন্যদিকে বড় ছেলে আমিনুলের এটা তৃতীয় স্ত্রী, নাম সুফিয়া। আমিনুলের প্রথম দুই বৌ চলে গেছে বিয়ের মাস ছয়েক এর মধ্যেই, পাড়া-প্রতিবেশীরা ধারণা করেছিল, সুফিয়াও বেশিদিন টিকবে না, কিন্তু ধারণা ভুল প্রমাণ করে সুফিয়া আমিনুলের সংসার করছে প্রায় বছর দুই।

ডুবে মারা যাওয়া নাতিটিকে নাজমা বেগম নিয়ে এসেছিলেন বছর তিন আগে, কুষ্টিয়ার একটা এতিমখানা থেকে, শিশুটির বয়স তখন মাত্র চার বছর ছিল। আমিনুলের দ্বিতীয় স্ত্রী তার কিছুদিন আগে ছেড়ে চলে যায়। এক ফকিরের কাছে গিয়েছিলেন নাজমা বেগম, আমিনুলের বৌ কিভাবে টিকবে সেটা জানতে। ওই ফকিরই পরামর্শ দেয়, এতিম বাচ্চাদের খাওয়ালে আমিনুলের উপর থেকে ফাঁড়া কেটে যাবে, বৌ ও টিকবে। সেই সূত্রেই ওই এতিমখানায় যান নাজমা।

শিশুটিকে যত্ন-আত্তির কোনো রকম ত্রুটি করেননি নাজমা বেগম, আমিনুলও নিজের ছেলের মতোই আদর করত। এর মধ্যে আমিনুলের আবার বিয়ে দিলেন নাজমা, বছর দুই হল, কোনো সন্তান এখনও হয়নি। তাই ওই নাতিটিই ছিল বাড়ির সবার মধ্যমণি।

গত তিনদিন ধরে প্রচন্ড গরম পড়ছে। নাজমা বেগম উঠানের পাশের ঘরটাতে ঘুমান, আগে সাথে নাতি ঘুমাত, এখন একা। মাঝের ঘরের চৌকিতে আসগার মিয়া ঘুমান, আমিনুল তার বৌ নিয়ে ভিতরের ঘরে। একটা ঘর ফাঁকাই পড়ে আছে, আক্কাস বিদেশ থেকে আসলে থাকে, মেহমান আসলে থাকে। একতলা বাড়ি, রান্নাঘর আর টয়লেট বাইরে। পুরো বাড়িটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। উঠানের এক প্রান্তে টিউবওয়েল আছে, একটু ঘিরে দেয়া আছে, ওই খানেই সবাই গোসল সারে। উঠানে একটা বড় পেয়ারা গাছ, বাড়ির আশেপাশে ও অনেক গাছ লাগিয়েছেন নাজমা বেগম।

ফুলের ছোট্ট একটা বাগান করেছেন বাড়ির সামনে, বড় ছেলে আমিনুল সারের ব্যবসা করে, কুষ্টিয়া শহরে যেতে হয় প্রায়ই, ওই নিয়ে আসে ফুলের চারা।

আজ আবার গরমের সাথে যোগ হয়েছে লোডশেডিং, নাজমা বেগম হাত পাখার বাতাস নিতে নিতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন। একটু একটু করে রাত গভীর হল, আসগার মিয়ার বাড়ি শুধু না, পুরো পাড়ায় তখন গভীর ঘুমে। রাত্রির নিস্তদ্ধতা ভেদ করে, একটা মোটরসাইকেল এসে থামল আসগার মিয়ার বাসার সামনে। দুইজন আরোহী নামল সেটা থেকে, মুখ গামছা দিয়ে বাঁধা তাদের। নিঃশব্দে পাঁচিল টপকে নাজমা বেগমের ঘরের সামনে দাঁড়াল। একজন পকেট থেকে সরু একটা পেন্সিল টর্চ লাইট বের করল। নাজমা বেগমের ঘরে টর্চ মেরে দেখে নিল তার অবস্থান। অন্যজন পকেট থেকে কিম্ভুত একটা পিস্তল বের করল, নাজমা বেগমের দিকে তাক করে ফায়ার করল কয়েকটা। পুরো পাড়া গুলির শব্দে কেঁপে উঠল, দূরে কোথাও কয়েকটা নেড়ি কুকুর ডেকে উঠল জোরে।আসগার মিয়া, তার ছেলে, ছেলের বৌ ছুটে আসল সবাই, আততায়ীরা ততক্ষণে মোটরসাইকেল করে চম্পট দিয়েছে। আশে পাশের বাড়ি থেকে প্রতিবেশীরাও ছুটে এলেন। পুরো ঘর ভেসে যাচ্ছে নাজমা বেগমের রক্তে। বিছানায় নাজমা বেগমের নিথর দেহ পরে আছে।

দুই.

আদিল দৌলতপুর থানায় এস আই হিসাবে জয়েন করেছে অল্প কয়েকদিন, মাস্টার্স কমপ্লিট করার সাথে সাথেই মিলে যায় চাকরিটা। ইচ্ছা ছিল বিসিএস দিয়ে বড় সরকারি কর্মকর্তা হবে, কিন্তু ফ্যামিলির অবস্থা খুব খারাপ। বাবা নেই, অনেকগুলো ভাই-বোন, আদিল সবার বড়। অল্প কিছু জমিজমা যা আছে তাই দিয়ে কষ্টে চলে সংসার। আদিল ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের খরচ নিজেই চালাত, জবটা কোনো ধরাধরি আর টাকা পয়সা ছাড়াই হয়ে গেল, তাই জয়েন করে ফেলেছে। তবে আশা ছাড়েনি, জবের পাশাপশি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, প্রিপারেশন নিচ্ছে বিসিএস এর।

জ থানায় এসেই এএসআই ইমরানের মুখে শুনল খবরটা।

-স্যার, গত রাতে এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা খুন হয়েছে, গুলি করে হত্যা, একেবারে স্পট ডেড। ইমরান জানালো।

-গাড়ি বের করতে বলো, ইমরান, ক্রাইমস্পটে যেতে হবে। আদিল বলল।

টেবিল থেকে ক্যাপটা তুলে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল এস আই আদিল খান, এ এস আই ইমরান আর দুই জন কনস্টেবলকে নিয়ে, তার পুলিশের চাকরির প্রথম কোনো খুনের তদন্ত করতে।

আসগার মিয়া একদম ভেঙ্গে পড়েছেন। একসপ্তাহের ব্যবধানে নাতি আর সহধর্মিনীকে হারিয়ে। আদিলকে ইমরান জানাল, খুন হওয়া ভদ্র মহিলার দুই ছেলে। স্বামী বিদেশে থাকত, ছোট ছেলে বিদেশে থাকে এখন, বাড়িতে উনি স্বামী, বড় ছেলে আর তার বৌসহ থাকতেন।

আসগার মিয়ার বড় ছেলে আমিনুলকে ডেকে নিল আদিল।

-বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা, কিন্তু তদন্তের স্বার্থে কিছু প্রশ্ন না করলেই নয়, আপনার মায়ের সাথে কি কারোর কোনো শত্রুতা ছিল?

-একদম না স্যার, আমার মা গ্রামের একজন সাধারণ মহিলা, কারো সাথে কোনো শত্রুতা ছিল না।

-আপনার পরিবারের সাথে অন্য কোনো পরিবারের গোলমাল, বা জমি নিয়ে শত্রুটা, এমন কিছু।

-না স্যার।

-ঠিক আছে, আপনি কাল আপনার বাবাকে নিয়ে একবার থানায় আসবেন।

আদিল খান ইমরান কে বলল

-ইমরান, বডি পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠাও, আর সবার কাছে খোঁজ-খবর নাও, কেউ খুনীদের চাক্ষুষ দেখেছে কিনা।

পরেরদিন আসগার মিয়া, ছেলে আমিনুল আর আমিনুলের ব্যবসার পার্টনার সায়ীদ থানায় আসল।

আদিল খান ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেকভাবে প্রশ্ন করল, বের করার চেষ্টা করল, কোনো শত্রু ছিল কিনা এই পরিবারের। তেমন কোনো যুৎসই তথ্য মিলল না।

আদিল ইমরান কে বলল

– ইমরান, সব কিছু দেখে তো মনে হচ্ছে এটা শুধু খুনের কেস, ডাকাতি বা লুটের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। সবার আগে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে খুনের মোটিভটা কি ছিল।

-এক্সাক্টলি স্যার, প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম। একজন শুধু জানাল দুইজন লোক, গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা, মোটরসাইকেল করে চলে যেতে দেখেছে। ইমরান জানাল।

-ইমরান, আমার সাবজেক্ট ছিল পুলিশ সাইন্স আর ক্রিমিনোলজি, একটা জিনিস শিখেছি, যে খুন হয় তার জীবন বৃত্তান্তই অনেক সময় বলে দেয় খুনীর পরিচয়। আমি এই নাজমা বেগমের পুরো জীবন কাহিনী জানতে চাই।

-হয়ে যাবে স্যার, একটা ইন্টারেস্টিং খবর আছে স্যার, আমাদের এক পুরাতন দাগী অপরাধী, কানা মজিদ, চোরাচালান, কিডন্যাপিংসহ আরো অনেক অপরাধের সাথে যুক্ত, কন্টাক্ট এ খুন ও করে শুনেছি, ওকে এক সহযোগী সহ খুনের দিন বিকালে ওই এলাকায় দেখা গেছে। আমাদের একজন ইনফরমার পাক্কা খবর দিয়েছে।

-বলো কি, তাই নাকি ? ভুরু কুঁচকালো আদিল।

নিজের মনের অজান্তেই বলে উঠল

-গ্রামের একটা সাধারণ গৃহবধূর জন্য কনটাক্ট কিলার।

তিন.

পরদিন সকালে ইমরান আদিল কে জানাল

-নাজমা বেগমের প্রতিবেশী এক মহিলা মেয়েসহ এসেছে,আপনার সাথে কথা বলবে।

-ঠিক আছে পাঠিয়ে দাও।

মহিলা মেয়েসহ আদিলের রুমে ঢুকল।

-স্যার, আমার মেয়ে আপনাকে কিছু বলবে। মহিলার কথায় স্থানীয় টান স্পষ্ট।

আদিল মেয়েটিকে দেখল, ১৪-১৫, বছর বয়স হবে হয়তো,

-কি বলবা বলো।

মেয়েটি একটু ইতস্তত করছে দেখে, আদিল মহিলাকে বলল

-আপনি একটু বাহিরে যান।

-নাম কি তোমার? আদিল জিজ্ঞেস করে।

-শেফালী

মেয়েটি উত্তর দেয়।

-শেফালী, যা বলবে বলো, কোনো ভয় নাই, তুমি নাজমা বেগমের কে হও ?

মেয়েটি এইবার সরাসরি আদিলের মুখের দিকে তাকায়

-উনি আমার নানি হন, দূর সম্পর্কের, আর আমিনুলকে মামা ডাকি স্যার, যেদিন আমিনুল মামার ছেলেটি মারা যায়, ওই দিন আমি আর সুফিয়া মামি ওই পুকুরের একটু পিছনে আম গাছে আম পাড়ছিলাম। পানিতে কিছু পড়ার শব্দে দুই জন গাছ থেকে নেমে পুকুরের পাশে যাই। সুফিয়া মামি পানিতে ঝাঁপ দেন।

মেয়েটি দম নেয়ার জন্য একটু থামে।

-স্যার, আমার কেন জানি মনে হয় সুফিয়া মামি ইচ্ছা করলে ছেলেটিকে বাঁচাতে পারতেন।

-কেন তোমার এমনটা মনে হয়।

-স্যার,সুফিয়া মামি অনেক ভালো সাঁতার কাটে। আমরা দুই জন ওই পুকুরে অনেকবার সাঁতারের পাল্লা দিয়েছি, আমি ভালো সাঁতার পারি না। কিন্ত মামি মাছের মতো সাঁতার কাটে।

মেয়েটির কথা শুনে আদিল খানের ভুরুটা কুঁচকে গেল।

-আচ্ছা শেফালী, তোমার কি মনে হয়, তোমার নাজমা নানিকে কে খুন করতে পারে।

-আমি জানি না স্যার, নানি অনেক রাগী ছিলেন, কিন্তু ভালো মানুষ ছিলেন।

-আচ্ছা, তোমার নানির সাথে তোমার সুফিয়া মামির সম্পর্ক কেমন ছিল ?

-ভালো ছিল না স্যার, ঝগড়া হত প্রায়ই।

-তোমার কি মনে হয়, তোমার সুফিয়া মামী নাজমা নানিকে খুন করতে পারে?

-আমার তা মনে হয় না স্যার।

-শেফালী, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, তুমি যেতে পার। দরকার হলে তোমাকে ডেকে নিব।

শেফালীরা চলে যাওয়ার পর, আদিল ইমরানকে ডেকে সব খুলে বলল।

-মেয়েটি ঠিকই বলেছে স্যার, শাশুড়ি-বৌ সম্পর্ক তেমন ভালোছিল না। আমি প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলেছি।

-ইমরান, এই সুফিয়া তো এখন মেইন সাসপেক্ট লাগছে। এর পুরো কুন্ডুলী আমার চাই, সেই সাথে ওই পরিবারের সবার মোবাইল ফোনের কল লিস্ট বের কর, দেখ সন্দেহভাজন কিছু মিলে কিনা।

দুইদিন পর সব তথ্য ইমরান আদিলের টেবিলে হাজির করল।

-স্যার আসগার মিয়া আর তার ছেলের কল লিস্টে তেমন কিছু নাই, ওর ছেলে আমিনুল বেশি কথা বলত ওর বিজনেস পার্টনার সায়ীদের সাথে।| সায়ীদ আগে প্রায় রাত্রে ওই বাড়িতে থাকত, সুফিয়া আসার পর আর থাকে না। ইমরান একটু থামল-আর নাজমা বেগম ছিলেন বাড়ির কর্ত্রী, আসগার মিয়াসহ সবাইকে তিনিই শাসন করতেন, তার কথাই ছিল সংসারের শেষ কথা। অনেক বদরাগী ছিলেন, বৌয়ের সাথে খিট খিট করতেন প্রচুর।

-তবে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, সুফিয়া কথা বলত একটা নম্বরে প্রচুর। ওইটা আসগার মিয়ার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে রবিউলের নম্বর। আর স্যার, সুফিয়া কিন্তু আমিনুলের তৃতীয় স্ত্রী, ওর প্রথম দুই বৌ টিকেনি বেশিদিন।

-ইন্টারেস্টিং! এক কাজ কর, আগের বৌদের কাছে একটু খোঁজ নাও, কেন তারা চলে গেল। আর ওই রবিউলকে একটু থানায় আসতে বল, ভাবীর প্রতি এতো কেয়ারিং দেবরের মুখটা একটু দেখি।

চার.

রবিউল মাথা নীচু করে বসে আছে আদিলের সামনে |

-রবিউল সাহেব, আমাদের কাছে কিছু লুকাবেন না দয়া করে, আমিনুলের বৌ সুফিয়ার সাথে আপনার কি সম্পর্ক ছিল?

-‘ইয়ে মানে স্যার, দেবর আর ভাবীর সম্পর্ক।

আদিল খুব জোরে ওর টেবিলে ঘুষি মারল।

-এই তুই মনে হয় সত্যি কথা সহজে বলবি না। তোর বিচির উপর রুলের দুই ঘা দিলেই সব সত্যি বের হবে।

রবিউল কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-বলছি স্যার, সুফিয়া ভাবীর সাথে আমার সম্পর্ক ছিল, কিন্তু স্যার, নাজমা চাচিকে আমি খুন করিনি।

-সম্পর্ক মানে কেমন সম্পর্ক?

-শারীরিক সম্পর্ক স্যার, এর থেকে বেশি কিছু না।

-এর থেকে বেশি আর কি থাকবে, এখন সত্যি সত্যি বল, নাজমা বেগম কি এই সম্পর্কের ব্যাপারে জানতো ?

-না স্যার জানতো না, তবে স্যার…

-তবে কি?

-স্যার, আমিনুল ভাইয়ের ছেলেটা স্যার, একদিন আমাদের দেখে ফেলেছিল। সুফিয়া ভাবি অবশ্য ওকে বুঝিয়েছে, কাউকে না বলার জন্য।

-আই সি, ঠিক আছে এখন যা, কিন্তু এই কেস শেষ না হওয়া পর্যন্ত শহর ছেড়ে কোথাও যাবি না।

রবিউল বের হয়ে যেতেই ইমরান ঢুকল আদিলের রুমে।

-স্যার আমিনুলের আগের দুই বৌয়ের সাথে কথা বলেছি, তাদের দুইজনেরই একই বক্তব্য, আমিনুল নাকি সেক্সচুয়ালি অ্যাডাল্ট ছিল না। শারীরিকভাবে অক্ষম কারো সাথে সংসার করবে না বলে চলে গেছে।

-হুম, ইমরান তুমি কাল আমিনুলের বৌ সুফিয়াকে থানায় আসতে বলবা, তদন্ত যে দিকে এগোচ্ছে সন্দেহের তীর ওর দিকেই যাচ্ছে। আর ওই কনটাক্ট কিলার কানা মজিদ, ওর কি খবর ?

-স্যার, মজিদ বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়া তে গা ঢাকা দিয়েছে। সব থানায় ওর ছবি পাঠিয়ে রেড এলার্ট জারি করেছি স্যার, আমাদের সব ইনফর্মারদের বলা আছে, দেশে ঢুকলেই পাকড়াও করব। তবে আমাদের একজন ইনফর্মার পাকা খবর দিয়েছে, ওই বিকালে কানা মজিদ নাকি খুন করার উদ্দেশ্যেই ওই এলাকায় আসে, আর এর জন্য ওকে কেউ সুপারী (টাকা) দিয়েছিল।

-হুম, খুন যে কানা মজিদ করেছে এটা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু ওকে ভাড়া করল কে? আদিল নিজের মনেই বলে উঠে…

-কে এই খুনের আসল মাস্টার মাইন্ড?

পাঁচ.

সুফিয়া বসে আছে আদিলের সামনে, আদিল খুব ভালো করে লক্ষ্য করছে সুফিয়াকে। মহিলা কালো হলেও যথেষ্ট সুন্দরী, চেহারায় বুদ্ধির ছাপ আছে।

-সুফিয়া আশাকরি আপনি আমার সব প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দিবেন, যদি মিথ্যা বলেন বা কিছু গোপন করেন এর পরিণতি কিন্তু ভালো হবে না। সুফিয়া আস্তে করে মাথা নাড়ে।

-কানা মজিদকে আপনি কিভাবে চিনেন ? আদিল খুব ভালো করে লক্ষ্য রাখছে, মহিলার মুখের এক্সপ্রেশন কেমন হয়।

-এই নামে আমি কাউকে চিনিনা স্যার। মহিলার কথাগুলো অনেক শুদ্ধ উচ্চারণের,স্থানীয় টান নাই।

-মিথ্যা বলে লাভ নাই সুফিয়া, আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে, আপনি কানা মজিদের সাথে কথা বলতেন নিয়মিত, আপনার মোবাইল কল রেকর্ডস তাই বলে।

-যাকে চিনিই না, তার সাথে কথা বলার প্রশ্নই উঠে না স্যার…সুফিয়া নির্বিকার। হয় মহিলা খুব চালাক আর না হলে নির্দোষ, ট্রিকটা কাজে লাগল না, আদিল এইবার অন্য রাস্তায় গেল।

-কানা মজিদকে চিনেন না মানলাম, কিন্তু এখন বলেন, রবিউলকে চিনেন? নাকি এর সাথেও চেনা পরিচয় ছাড়াই কথা বলেছেন ?

-চিনি স্যার, সম্পর্কে আমার দেবর হয়। সুফিয়া মাথা নাড়ে।

-আপনাদের দেবর-ভাবীর সম্পর্কটা একটু বেশিই আন্তরিক ছিল তাই না?

সুফিয়া উত্তর দেয় না, মাথা নীচু করে থাকে।

-চুপ থেকে কোনো লাভ নাই সুফিয়া, আপনাদের এই সম্পর্কটা আপনাদের পালিত ছেলেটিও দেখে ফেলেছিল, তাই ও পুকুরের পানিতে পড়লে ইচ্ছাকৃতভাবেই তাকে বাঁচাননি আপনি।

-‘মিথ্যা কথা স্যার, একদম মিথ্যা কথা…আমি আমার সাধ্য মতো চেষ্টা করেছি, আর হ্যাঁ, রবিউলের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। আর এটা আমাদের ছেলেটি দেখেও ফেলেছিল, কিন্তু এর জন্য ওকে বাঁচাব না? আমিও ওকে আমার ছেলের মতোই দেখতাম।

-এটাই সত্যি সুফিয়া, আর আপনার দেবরের সাথে আপনার মেলামেশাটা যাতে সহজ হয়, তাই শাশুড়িকেও রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলেন।

-না স্যার, আমি মানছি শাশুড়ির সাথে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল না, কিন্তু তাকে খুন করব কেন?

-খুন করবেন এই জন্য, যাতে আপনাদের সম্পর্কটা ফাঁস না হয়ে যায়।

-আমি সত্যিই আমার শাশুড়িকে খুন করিনি স্যার, হ্যাঁ, আমার অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু স্যার, আমি বাধ্য হয়েছি, আপনি হয়তো জানেন আমি আমার স্বামীর তিন নম্বর বৌ, আমার স্বামী শারীরিকভাবে অক্ষম, আগের দুই বৌ চলে গেছে এই জন্য।

-আগের দুই জন চলে গেছে, আপনি যান নি কেন?

-কোথায় যাবো স্যার, কোথায় যাবো আমি? আমার তো কেউ নাই, আমার জন্ম ইন্ডিয়ার বর্ডারের কাছে একটা গ্রামে, বাবা-মা কে আমি জানি না, এক ফুফু কিছুটা বড় হলে, কুষ্টিয়ার একটা বাড়িতে কাজে দেয় আমাকে, এরপর ঢাকায় একটা বাড়িতে কাজ করতাম আমি। আমার শাশুড়ির দূরসম্পর্কের ভাই হন ওই বাড়ির কর্তা, আমার শাশুড়ি ছেলের দুই বৌ চলে যাওয়ার পর আমাকে নিয়ে আসেন বৌ করে। সুফিয়া একটু থামে দম নেয়ার জন্য, -এই বাড়িতে তো আমার তিন বেলা খাবার জুটতো স্যার, তাই চলে যাবো কেন? আর কোথায় বা যাবো?

এই জন্যই হয়তো মহিলার উচ্চারণগুলো বেশ শুদ্ধ , আদিল মনে মনে ভাবে,

-আপনি এখন যেতে পারেন সুফিয়া। কিন্তু দরকার হলে আপনাকে আবার ডাকব।

সুফিয়া বের হয়ে যেতেই ইমরান ঢুকল আদিলের রুমে, -আমাদের জন্য একটা খারাপ খবর আছে স্যার, কানা মজিদ লুকিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার সময় বর্ডার গার্ডের গুলিতে সহযোগী সহ মারা গেছে।

-ওহ নো! এখন তো এই কেসটা সলভ করা অনেক কঠিন হয়ে গেল।

-‘কানা মজিদের কাছে একটা মোবাইল পাওয়া গেছে স্যার, ওইটার কল লিস্ট দেখি, কোনো লিড মিললেও মিলতে পারে।

ছয়.

আদিল খান গোমড়া মুখে বসে আছে তার রুমে। নাজমা বেগম মার্ডার কেসে তেমন কোনো ব্রেক থ্রু মিলছে না, কানা মজিদকে জীবিত ধরা গেলে হয়তো কিছু মিলত। জীবনের প্রথম খুনের কেস, কোথাও কিছু একটা মিস করছে মনে হয়। কাগজ কলম নিয়ে সবগুলো নাম লিখল আবার-

১.নাজমা বেগম (খুন হয়েছেন)

২.আসগার মিয়া (নাজমা বেগমের স্বামী )

৩.আমিনুল মিয়া (নাজমা বেগমের বড় ছেলে)

৪.আক্কাস মিয়া (নাজমা বেগমের ছোট ছেলে, ওমান থাকে)

৫.সুফিয়া ( নাজমা বেগমের পুত্রবধূ, আমিনুলের বৌ)

৬.রবিউল (আমিনুলের চাচাতো ভাই, সুফিয়ার সাথে সম্পর্ক আছে)

৭.সায়ীদ ( আমিনুলের ব্যাবসার পার্টনার )

৮.শেফালী( নাজমা বেগমের প্রতিবেশী, ওর ধারণা আসগার মিয়ার নাতিটি কে সুফিয়া ইচ্ছা করে বাঁচান নি)

৯.শেফালীর মা

১০.কানা মজিদ আর তার সহযোগী ( বিজেপিএর গুলিতে দুইজনই নিহত)

নাটকের চরিত্র আপাতত এই গুলোই, আক্কাস মিয়াকে হয়তো বাদ দেয়া যেতে পারে। ও ওমান থাকে। কিন্তু ওমান থেকেও তো মজিদের সাথে কন্টাক সম্ভব। তবে আক্কাস ওর মাকে মারবে কেন? মোটিভটা কি? সব প্রশ্ন এই এক জায়গায় এসে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

মোটিভ??? কি হতে পারে, কেন মারবে?

সুফিয়া আর রবিউলের কাছে মোটিভ আছে একটা, কিন্তু কোনো প্রমাণ নাই। কানা মজিদের সাথে, এদের কোনো যোগসূত্র মিলেনি। নাজমা বেগম মার্ডার কেস কি অমীমাংসিতই থেকে যাবে ?

হঠাৎ ইমরান হন্তদন্তভাবে ঢুকল আদিলের রুমে।

-স্যার কানা মজিদের মোবাইল কল রেকর্ডস এসে গেছে, চমকে দেবার মতো একটা নম্বর মিলেছে। কানা মজিদ বেশ কয়েকবার কথা বলেছে এই নম্বরের মালিকের সাথে। এই কেসের ভাইটাল ব্রেক থ্রু।

ইমরানের হাত থেকে কল রেকর্ডস এর কাগজটা ছিনিয়ে নিল আদিল।

-তুমি ঠিকই বলেছ ইমরান, নাজমা বেগম মার্ডার কেস বোধহয় সমাধান করে ফেললাম আমরা, নাটকের অমীমাংসিত রহস্য তো এখন এই নম্বরের মালিকই ফাঁস করবে

সাত.

নাজমা বেগমের বড় ছেলে আমিনুলের ব্যাবসার পার্টনার সায়ীদ বসে আছে আদিলের সামনে। সায়ীদের ঠোঁটের কোনা কেটে গেছে, চোখ- মুখ ফোলা। উঠিয়ে নিয়ে আসার পর কিছুই স্বীকার করছিল না, তাই কনস্টেবলের ডান্ডার বারি ভালোই পড়েছে পিঠে। অনেক মার খাওয়ার পর এখন মুখ খুলেছে।

-সায়ীদ সাহেব, কানা মজিদের সাথে আপনার একাধিকবার কথা হয়েছে, যেদিন নাজমা বেগম খুন হয়, ঐদিন বিকালে আপনার আর কানা মজিদের মোবাইল কল লোকেশন ছিল নাজমা বেগমের বাড়ির সামনে। আমাদের কাছে লুকিয়ে লাভ নেই কিছু।

যদি আর মার খেতে না চান, তবে সব সত্যি কথা বলবেন, নাজমা বেগমকে মারার জন্য কানা মজিদকে আপনি টাকা দিয়েছিলেন ?

-হ্যাঁ স্যার।

-কিন্তু কেন ?

-আমি সমকামী স্যার, নাজমা বেগমের বড় ছেলে আমিনুল ছিল আমার পার্টনার। আগে প্রায়ই ওই বাড়িতে থাকতাম, কিন্তু সুফিয়ার সাথে আমিনুলের বিয়ে হওয়ার পর সেটা আর সম্ভব হয় না। আমিনুলের আগের দুইটা বৌ চলে গেছে, ভেবেছিলাম সুফিয়াও চলে যাবে, কিন্তু ও ওই বাড়িতে গেড়ে বসেছে।

- আই সি, তার মানে আমিনুলও ছিল সমকামী।আর তাই নারী শরীরের প্রতি কোন আকর্ষণ ছিল না, তাই ওর বউরা বলতো আমিনুল শারিরীকভাবে অক্ষম। কিন্তু এর মধ্যে নাজমা বেগম আসল কেন? তাকে মারলেন কেন?

-নাজমা বেগমকে তো আমি মারতে চাইনি স্যার, আমি চেয়েছিলাম সুফিয়া কে মারতে। ওকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে আমাদের মেলামেশার সুবিধা হত। ওই দিন বিকালে আমি কানা মজিদকে দেখিয়েও দিয়েছিলাম সুফিয়াকে। কিন্তু কানা মজিদ মিসটেক করে ফেলেছে, বিকালে সুফিয়া নীল শাড়ি পড়েছিল। রাতে নাজমা বেগম ও নীল শাড়ি পরে ঘুমিয়েছিলেন। সুফিয়ার বদলে ও নাজমা বেগমকে মেরে ফেলে, তাই ওর সব টাকা আমি দেই নাই। এই জন্য আমাকে ফোন দিত।

-মিসটেক তো আপনি করেছেন সায়ীদ, জীবনের সবচেয়ে বড় মিসটেক। যে সম্পর্কের কথা আমি বলছেন, সেটি আমাদের সমাজে নিন্দনীয়, ধর্মেও স্বীকৃত না। আর সেই ঘৃণ্য সম্পর্কের জন্য, একটা নিরীহ মানুষের জান নিয়ে নিলেন। এখন এই মিসটেকের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, সারাজীবন জেল এ পচে।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

My Country 🇧🇩🇧🇩